উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা অর্থনীতির সমালোচনা

একাদশ জাতীয় সংসদের ষষ্ঠ অধিবেশনে সরকারের উন্নয়ন আর প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের প্রশংসায় সরব ছিলেন সরকারি দলের মন্ত্রী-সাংসদেরা। উন্নয়নের প্রশংসা ছিল জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সাংসদদের মুখেও। অবশ্য তাঁরা কিছু ক্ষেত্রে সমালোচনাও করেছেন। বিপরীতে বিএনপির সাংসদেরা ছিলেন নির্বাচন ও অর্থনীতি নিয়ে সমালোচনামুখর। দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিও প্রাধান্য পেয়েছে তাঁদের বক্তব্যে। এই অধিবেশনে দুই দফা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে দলটি। ১৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হয় ষষ্ঠ অধিবেশন। গত ৯ জানুয়ারি শুরু হওয়া এই অধিবেশনের প্রথম দিন সংসদে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। ২৮ কার্যদিবসের এই অধিবেশনজুড়ে ছিল রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা। এই অধিবেশনে উত্তাপ ছড়িয়েছিল ৬১টি সংস্থার তহবিলের উদ্বৃত্ত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা নেওয়ার জন্য আনা বিল। ক্ষমতাসীন দলের সাংসদদের বক্তব্যের মূল সুর ছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ, সাহসী ও সৎ নেতৃত্বে বাংলাদেশ বদলে গেছে। দেশের উন্নয়ন এখন বিশ্বের কাছে এক বিস্ময়। পাশাপাশি বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের সমালোচনাও করেছেন অনেকে। সাংসদদের মধ্যে ভিন্নধর্মী বক্তব্য দিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। তিনি মনে করেন, সাংসদেরা নিজের বিবেক, বিচারবুদ্ধি ও এলাকার জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন না। এ জন্য তিনি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করার প্রস্তাব করেন। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, মোট ২২৭ জন সাংসদ রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নেন। এর মধ্যে সরকারি দল আওয়ামী লীগের ১৯২ জন সাংসদ আলোচনায় অংশ নেন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির ১৮ জন, বিএনপির ৫ জন এবং বাকিরা অন্যান্য দলের। খালেদার মুক্তির দাবিতে সরব বিএনপি রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর এই আহ্বানকে ‘প্রহসন’ বলে উল্লেখ করেন বিএনপির সাংসদেরা। তাঁরা বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে জাতীয় ঐক্য সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছা ও আন্তরিকতা ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয় বলে সংসদে উল্লেখ করেছেন বিএনপির সাংসদ মোশাররফ হোসেন। বিএনপির সাংসদেরা বলেছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে বলে সরকার প্রচার চালালেও গত এক বছরে অর্থনীতির সামষ্টিক সূচকগুলো ক্রমাগত খারাপ হতে হতে এখন বিপজ্জনক অবস্থায় আছে। বেসরকারি বিনিয়োগ খারাপ। শেয়ারবাজার ধসে পড়েছে। একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়েও সমালোচনা করে সংরক্ষিত আসনের সাংসদ রুমিন ফারহানা সংসদে বলেন, আগের রাতে ভোট দিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের নজির নেই। নির্বাচন কমিশন যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে, রাষ্ট্রপতির ভাষণের এই অংশসহ সব ‘অসত্য তথ্য’ এক্সপাঞ্জের দাবি তোলেন বিএনপির সাংসদ হারুনুর রশীদ। বিল নিয়ে উত্তাপ, বিএনপির ওয়াকআউট ৫ ফেব্রুয়ারি ৬১টি সংস্থার তহবিলের উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে নিতে সংসদে আইন পাসের জন্য বিল তুলেছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এই বিল পাস করাতে গিয়ে বিরোধী দলের তীব্র বিরোধিতা ও সমালোচনার মুখে পড়েন অর্থমন্ত্রী। বিএনপি ও জাতীয় পার্টির একাধিক সাংসদ এই আইনকে ‘কালো আইন’ আখ্যা দিয়ে এটি প্রত্যাহারের দাবি জানান। বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সদস্যরা নিজেদের দেওয়া সংশোধনী প্রস্তাবগুলো প্রত্যাহার করে নেন। সাম্প্রতিক সময়ে সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপনকারী সদস্যদের সবাইকে নিজেদের প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিতে দেখা যায়নি। তবে শেষ পর্যন্ত কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিএনপি। এই অধিবেশনে মোট সাতটি বিল পাস হয়। অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর উত্তর দেওয়ার জন্য প্রশ্ন জমা পড়ে ১২৪টি। এর মধ্যে ৫৫টি প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। অন্যান্য মন্ত্রীদের জন্য ২ হাজার ৯০২টি প্রশ্ন জমা পড়ে। মন্ত্রীরা ২ হাজার ৩৭৬টি প্রশ্নের জবাব দেন। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ও জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য মুলতবি প্রস্তাব আনার সুযোগ আছে। এই অধিবেশনে জাতীয় পার্টির রুস্তম আলী ফরাজী ‘করোনাভাইরাস নিয়ে আশু করণীয়’ ও ‘ঢাকার বায়ুদূষণ রোধ’ প্রসঙ্গে দুটি মুলতবি প্রস্তাব এনেছিলেন। তবে ওই বিষয় দুটি নিয়ে ইতিমধ্যে সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে জানিয়ে প্রস্তাব দুটি নাকচ করা হয়। ভোটে অনাগ্রহ  ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়া প্রসঙ্গে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, মানুষের এমন অনাগ্রহ নির্বাচন তো বটেই, রাজনৈতিক দলগুলোকেও অপ্রাসঙ্গিক করে তুলবে। ভোটে অনাগ্রহ কেন, তা উপলব্ধি করতে সরকার ও দলের সাংসদদের প্রতি আহ্বান জানান সরকারি দলের জ্যেষ্ঠ সাংসদ মোহাম্মদ নাসিম। সংসদ বিষয়ে গবেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি দল ও বিএনপির মধ্যে কিছুটা সহিষ্ণুতা দেখা গেছে। আগে সংসদে এই দুই দলের মধ্যে যেভাবে হইচই হতো, কথা বলতে বাধা দেওয়া হতো এবার সেটা খুব বেশি দেখা যায়নি। বিএনপিও আগের মতো কথায় কথায় ওয়াকআউট করছে না। এগুলো ইতিবাচক। বিরোধী দল শক্তিশালী হলে সংসদ আরও বেশি প্রাণবন্ত ও কার্যকর হতো।