মমতাজউদ্‌দীন আহমদের চলে যাওয়ার দিন আজ

 দেখতে দেখতে এক বছর হয়ে গেল নাট্যজন অধ্যাপক মমতাজউদ্‌দীন আহমদের চলে যাওয়ার। গেল বছর এই দিন, ২ জুন দুপুরে শেষবারের মতো পৃথিবীর বাতাসে নিশ্বাস নেন গুণী এই মানুষটি। চিরতরে চলে যাওয়ার আগে শেষ জন্মদিনে (১৮ জানুয়ারি ২০১৯) তাঁরই উপস্থিতিতে পরিবারের পক্ষ থেকে একটি ঘোষণা দেওয়া হয়। জানানো হয়, প্রতিবছর নাটকে বিশেষ অবদানের জন্য ‘অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ নাট্যজন পুরস্কার’ প্রদান করা হবে। ঘোষণাটি শুনে গেলেন, কিন্তু বাস্তবায়ন নিজ চোখে আর দেখে যেতে পারলেন না প্রখ্যাত এই নাট্যকার-নির্দেশক-অভিনেতা। তবে মমতাজউদ্‌দীন আহমদের পরিবার কথা রেখেছে। মৃত্যুর পর প্রথম জন্মদিনেই প্রদান করা হয়েছে সেই পুরস্কার। ইতিমধ্যে প্রথম আয়োজনে নাটক ও সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য ‘অধ্যাপক মমতাজউদ্‌দীন আহমদ নাট্যজন পুরস্কার-২০১৯’ পদক পেয়েছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর। তবে আগামী দিনে মমতাজউদ্‌দীন আহমদের পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় পুরস্কারটি দেওয়া হবে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে। মমতাজউদ্‌দীন আহমদ পরিবারের সদস্য শাহরিয়ার মাহমুদ প্রিন্স বলেন, ‘প্রথমবার আমাদের নিজেদের উদ্যোগে এই পুরস্কার দিলেও এখন থেকে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ কাজটি করবে। ইতিমধ্যে পরিবারের পক্ষে ৩৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে বাংলা একাডেমিকে। এ বিষয়ে একটি চুক্তিও হয়েছে।’ বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। জানা গেছে, মমতাজউদ্‌দীন আহমদের স্মৃতি রক্ষার্থে মমতাজউদ্‌দীন আহমদ স্মৃতি সংসদ গঠন করা হয়েছে। এর সভাপতি আসাদুজ্জামান নূর, সেক্রেটারি গোলাম কুদ্দুছ এবং শাহরিয়ার মাহমুদ সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করবেন। মমতাজউদ্‌দীন আহমদ শিক্ষক ও লেখক হিসেবে পরিচিতি পেলেও মঞ্চনাটকের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সংস্কৃতি অঙ্গনের কর্মী হিসেবে সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। তাঁর লেখা নাটক ‘কি চাহ শঙ্খ চিল’ ও ‘রাজা অনুস্বরের পালা’ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে তালিকাভুক্ত। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ১৯৭৬-৭৮ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়নে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭-৮০ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক ছিলেন। ২০১১ সাল থেকে তিনি জাতিসংঘের বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৫ সালের ১৮ জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার হাবিবপুর থানার আইহো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মমতাজউদ্‌দীন আহমদ। তাঁর বাবা কলিমুদ্দিন আহমদ ও মা সখিনা বেগম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় বিএ (অনার্স) ও এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি বাম রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালে গোলাম আরিফ টিপুর সঙ্গে তিনি রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন। সেই সময় রাজশাহী কলেজে বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণেও ভূমিকা রাখেন। রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার কারণে চারবার কারাবরণ করেন। মমতাজউদ্‌দীন আহমদের লেখা জনপ্রিয় নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বিবাহ’, ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, ‘বর্ণচোরা’, ‘এই সেই কণ্ঠস্বর’, ‘সাতঘাটের কানাকড়ি’, ‘রাজা অনুস্বরের পালা’, ‘বকুলপুরের স্বাধীনতা’, ‘সুখী মানুষ’, ‘রাজার পালা’, ‘সেয়ানে সেয়ানে’, ‘কেস’, ‘ভোটরঙ্গ’, ‘উল্টো পুরান’, ‘ভেবে দেখা’ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া তাঁর বেশ কিছু নাটক বাংলাদেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শতাধিক বই লিখেছিলেন মমতাজউদ্‌দীন আহমদ। তাঁর লেখা বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বাংলাদেশের নাটকের ইতিবৃত্ত’, ‘বাংলাদেশের থিয়েটারের ইতিবৃত্ত’, ‘প্রসঙ্গ বাংলাদেশ’, ‘প্রসঙ্গ বঙ্গবন্ধু’, ‘আমার ভেতরে আমি’, ‘জগতের যত মহাকাব্য’, ‘মহানামা কাব্যের গদ্য রূপ’, ‘সাহসী অথচ সাহস্য’, ‘নেকাবী এবং অন্যগণ’, ‘সজল তোমার ঠিকানা’, ‘এক যে জোড়া, এক যে মধুমতি’, ‘অন্ধকার নয় আলোর দিকে’। সর্বশেষ ১ জুন বিশ্বসাহিত্য ভবন থেকে প্রকাশ পায় তাঁর সর্বশেষ বই ‘আমার প্রিয় শেক্‌সপিয়ার’। ১৯৯৭ সালে নাট্যকার হিসেবে একুশে পদকে ভূষিত হন মমতাজউদ্‌দীন আহমদ। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, শিল্পকলা একাডেমি বিশেষ সম্মাননা, শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কারসহ দেশ-বিদেশের বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।