জাপানের করোনা-মুক্তি: সাফল্য-গাঁথার পেছনে

গত মাসের ২৬ তারিখে নির্ধারিত সময়সীমার প্রায় সপ্তাহখানেক আগে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে রাজধানী টোকিওসহ অবশিষ্ট পাঁচটি জেলা থেকে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেন। এতে সন্দেহবাদীদের অনেকেই মনে করেছিলেন জাপান সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশের করোনাভাইরাস পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে। তবে গত এক সপ্তাহে দেশের কয়েকটি জায়গায় নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার বাইরে সার্বিকভাবে পরিস্থিতির তেমন কোনো নাটকীয় অবনতি লক্ষ্য করা যায়নি। মানুষ এখন কিছুটা সংযম বজায় রাখা সত্ত্বেও ধীরে আবারও বাইরে বের হয়ে আসতে শুরু করেছেন। অন্যদিকে দেশের স্কুলগুলোতেও সোমবার থেকে আবার ক্লাস শুরু হয়েছে। ফলে বলা যায় করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ের পতাকা এখনো তুলে না ধরলেও সাফল্য অনেকটাই জাপানের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। এপ্রিল মাসের ৭ তারিখে জাপানে প্রথম সীমিত আকারে জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পর থেকে দেশের নাগরিক জীবন ছিল ঘরবন্দী, যদিও জরুরি অবস্থায় লকডাউনের মতো বাইরে বের হওয়ার ওপর সার্বিক নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়নি। এর দিন দশেক পর সারা দেশকে জরুরি অবস্থার আওতায় নিয়ে আসা হলে সীমিত মাত্রায় হলেও কিছুটা আতঙ্ক জনগণের মনে ছড়িয়ে পড়তে দেখা গিয়েছিল। অনেকেই তখন জাপানকে এই বলে দুষছিলেন যে ভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষা জাপান খুবই সীমিত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখায় অচিরেই নতুন সংক্রমণের বিস্ফোরণ দেশে লক্ষ্য করা যাবে, যার পরিণতিতে স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থায় ধস নামবে। তবে সেরকম সমালোচনা সত্ত্বেও জাপান সরকারের উপদেষ্টা প্যানেল এ কারণে অবস্থান থেকে সরে আসেনি যে প্যানেল মনে করেছে কোনোরকম উপসর্গহীন সুস্থ লোকজনের জন্য করোনা পরীক্ষা চালানোর ব্যবস্থা করে দেওয়া হলে হাসপাতালের ওপর অযথা চাপ তা বাড়িয়ে দেবে এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ায় ইতিমধ্যে হিমশিম খেতে হওয়া চিকিৎসা কর্মীদেরও তা বিপাকে ফেলবে। শুধু তাই নয়, এমনকি হালকা উপসর্গ দেখা দেওয়া করোনা আক্রান্তদের হাসপাতালে ভর্তি না করে বরং নিজেদের বাড়িতে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ এদের দেওয়া হয়। পরবর্তীতে অবশ্য সরকার এ রকম হালকা উপসর্গের রোগীদের বিচ্ছিন্ন রাখার জন্য হোটেল ভাড়া নিয়েছিল, যদিও সেই সব হোটেলে রোগীর তেমন ভিড় দেখা যায়নি। এসব ব্যবস্থার কারণে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার সংখ্যা সর্বোচ্চে পৌঁছে যাওয়ার পর ধীরে তা আবারও নামতে শুরু করলে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার বিষয়টি সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দেখতে হয়। জরুরি অবস্থা চলাকালে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় দেশের অর্থনীতির ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব তা রাখতে শুরু করে। সেই দিকটি বিবেচনায় রেখে যতটা সম্ভব কম সময়ের মধ্যে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া সরকার বিবেচনা করে দেখলেও সিদ্ধান্তকে যুক্তিসংগত করে তুলতে শুরুতে বেশ কয়েকটি পূর্বশর্ত সরকারকে নির্ধারণ করে নিতে হয়েছিল, যার মধ্যে প্রথমেই ছিল প্রতি এক লাখ জনসংখ্যায় নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার আনুপাতিক হিসাব ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে আসা। জাপানে করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে শুরুর দিনগুলোতে অনেকটা হইচই শোনা গেলেও চিহ্নিত সংক্রমণের সংখ্যা কিংবা মৃত্যুর হিসাব, কোনোদিক থেকেই জাপানের অবস্থা পশ্চিমের অনেক দেশের মতো আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছে যায়নি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী গত সোমবার পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার ব্যক্তি জাপানে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। এদের মধ্যে প্রায় ৯০০ জন মারা গেছেন। দুই হিসাবই বলে দেবে জাপানের পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক আকার নেয়নি। যদিও এপ্রিল মাসের শুরুতে ধারণা করা হচ্ছিল, চীন কিংবা ইউরোপের মতো একইরকম বিপর্যয় জাপানেও দেখা দিতে পারে। অস্বীকার করার উপায় নেই ভাইরাস পরিস্থিতি সামাল দেওয়ায় শুরুতে জাপানের নেওয়া পদক্ষেপ ছিল অনেকটাই যেন বিভ্রান্তিকর। জানুয়ারি মাসে উহান দুর্যোগের সূত্র ধরে জাপানে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে প্রমোদ তরী ডায়মন্ড প্রিন্সেসের গুচ্ছ সংক্রমণ হঠাৎ করে দেশের দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কি করণীয় তা নিয়ে জাপানের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। বলা যায় বিভ্রান্তির সূচনা সেখান থেকে। তবে দেশের ভেতরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে জাপান সেই বিভ্রান্তির অবস্থা দ্রুত কাটিয়ে উঠে এবং সংকট মোকাবিলার নিজস্ব পথ ধরে অগ্রসর হতে শুরু করে। সেই পথে জাপানের সাফল্য এখন অনেকের কাছেই বিস্ময় হিসেবে ঠেকছে। তবে সাফল্যের পেছনে সরকারের দেওয়া দিক নির্দেশনা ছাড়া জাপানের প্রচলিত স্বাস্থ্যবিধিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মাস্কের ব্যবহার যেমন জাপানে নতুন কিছু নয়। একইভাবে নিয়মিত হাত ধোঁয়া এবং বাইরে থেকে ফিরে এসে পোশাক বদলানো সহ স্নানের অভ্যাসও দূষণ ঘরের বাইরে রাখতে জাপানিদের সাহায্য করেছে। ফলে জরুরি অবস্থায় ঘরে আটকা পড়া মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ তেমন দেখা যায়নি। বরং অনেকে সংক্রমিত হয়েছেন হাসপাতাল সূত্রে। ফলে হাসপাতালে ভিড় হওয়া এড়িয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে সংক্রমণ সামাল দেওয়া জাপানের জন্য ছিল যুক্তিসংগত। সংখ্যাগত হিসাবের উঠানামা সত্ত্বেও করোনাভাইরাস ধীরে প্রশমিত হয়ে আসার চিহ্ন পরিষ্কার হয়ে ওঠার মুখে জাপান কিন্তু এখনো সতর্কতা বজায় রেখে চলেছে। নতুন আরেকটি তরঙ্গ এলে পরিস্থিতির খুব বেশি অবনতি যেন না হয়, সে জন্য ইংরেজি আদ্যক্ষর সি দিয়ে শুরু হওয়া তিনটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার উপদেশ নাগরিকদের দেওয়া হচ্ছে। বিষয় তিনটি হচ্ছে বায়ু চলাচল সীমিত থাকা বদ্ধ কোনো স্থানে অবস্থান না করা, সাধারণত সংগীতের লাইভ শো আয়োজনের ছোট আকারের হলো এবং কারাওকে বার ও সেরকম কিছু বিনোদনের স্থান যার মধ্যে দিয়ে চিহ্নিত করা হয়; ভিড়ের জায়গা থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকা; এবং অন্য মানুষের খুব কাছাকাছি সংযোগে না আসা। দেশের লোকজন এর সব কটি কম বেশি মেনে চললে চূড়ান্ত বিজয় অচিরেই অর্জন করা সম্ভব হবে বলে সরকারের পাশাপাশি চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন। ফলে করোনার ভীতিও এখন ধীরে কেটে যেতে শুরু করেছে। তবে দেশের অবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসবে কিনা, সেই প্রশ্ন অবশ্য থেকেই যাচ্ছে। কেননা করোনা দূর হতে চললেও ধ্বংসের যে ছায়া এই অদৃশ্য শত্রু রেখে যাচ্ছে, তা থেকে মুক্ত হওয়ার সহজ পথ মনে হয় খোলা নেই।