সেপ্টেম্বরে জ্বলবে মঞ্চের আলো

টানা পাঁচ মাস মঞ্চের সঙ্গে যোগাযোগ নেই থিয়েটারকর্মীদের। দেশের অন্যান্য বিনোদন অঙ্গনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শুরু হয়েছে কাজ। খুলেছে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও মার্কেট। থিয়েটারকর্মীদের অনেকেই এখন নিরাপত্তা মেনে মঞ্চে ফিরতে আগ্রহী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে হচ্ছে লেখালেখিও। প্রাঙ্গণেমোর নাট্যদলের নাট্যকার, অভিনেতা ও নির্দেশক অনন্ত হিরা ১৩ আগস্ট ফেসবুকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিসহ অন্যান্য মঞ্চ খুলে দেওয়া নিয়ে তিনটি প্রস্তাব দেন। সেগুলো হলো—সারা দেশের শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে খুলে দেওয়া, বিশেষ প্রণোদনা হিসেবে হলভাড়া মওকুফ করা এবং প্রথম তিন মাস শুধু শুক্র, শনিবারসহ বন্ধের দিনগুলোতে পরীক্ষামূলকভাবে মিলনায়তন বরাদ্দ দেওয়া। এই প্রেক্ষাপটে নাট্যকর্মী, নাট্যকার, নির্দেশক ও থিয়েটারসংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁদের অনেকেই একটি নিয়মের মধ্য দিয়ে শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তন খুলে দেওয়ার পক্ষে। নাট্যকার, অভিনেতা ও নির্দেশক মামুনুর রশীদও হল খুলে দেওয়ার পক্ষে। তিনি বলেন, ‘একজন নাট্যকর্মী হিসেবে আমি চাইব, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হল খুলে দেওয়া হোক। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যদি খুলে দেওয়া যায়, অন্তত অলস দিনগুলোর অবসান হয়।’ এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেবেন কি না? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমরা উদ্যোগ নেব। আমরা আবেদন করব যত দ্রুত সম্ভব হল খুলে দেওয়ার জন্য।’ নাট্যকার মাসুম রেজা মনে করেন, সপ্তাহে সাত দিন না হলেও দুদিন করা যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিয়ে যদি মহড়াকক্ষও চালু করা যায়, তাহলে কাজটা শুরু হবে। না হলে সবকিছু স্থবির হয়ে যাবে। দর্শকদের জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে আসন গ্রহণ করার সুযোগ তৈরি করা হবে। কিন্তু একটি নাটকে অনেক সময় ৩০ থেকে ৪০ জন অভিনেতা থাকেন। তাঁরা একসঙ্গে কীভাবে অভিনয় করবেন? বিষয়টি নিয়েও ভাবছেন নাটকের দলের লোকেরা। অনেকেরই অভিমত, একক নাটক কিংবা স্বল্পসংখ্যক অভিনেতা নিয়ে তৈরি প্রযোজনাগুলো এই সময়ে মঞ্চে আনার পক্ষে নাটকের দলগুলো। বটতলার সৃজনশীল নির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দার বলেন, ‘অভিনেতারা মাস্ক নিয়ে অভিনয় করতে পারবেন না। সে জায়গা থেকে দলগুলোর উচিত একক নাটক কিংবা দুই থেকে তিনজন অভিনেতার নাটকগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে মঞ্চায়ন শুরু করা।’ নাটকের দলগুলোর সবচেয়ে বড় সংগঠন বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ইতিমধ্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কাছে সেপ্টেম্বরের মধ্যে হল খুলে দেওয়ার অনুরোধ করে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। এটি নিশ্চিত করে ফেডারেশনের মহাসচিব কামাল বায়েজীদ বলেন, ‘আমরা অফিশিয়ালি শিল্পকলা একাডেমিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে হল খোলার একটি চিঠি দিয়েছি। প্রত্যাশা করছি সেপ্টেম্বর থেকে শিল্পকলা একাডেমি খুলে দেওয়া হবে।’ কামাল বায়েজীদ আরও জানান, দীর্ঘ এই পাঁচ মাস হল বন্ধ থাকায় নাটক দেখায় একটা অনভ্যস্ততা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে করোনার ভয়ে দর্শকও কম আসার আশঙ্কা আছে। সে কারণে সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে ফেডারেশনের উদ্যোগে নাট্যশালা ও মহিলা সমিতিতে নাটকের দলগুলোকে ভর্তুকি দিয়ে বিনা মূল্যে হলভাড়ায় নাটক প্রদর্শনীর সুযোগ করে দেওয়া হবে। ফেডারেশনের বাইরে ও ভেতরে সব দলই এখানে অংশগ্রহণ করতে পারবে। তবে স্বল্প অভিনেতা ও ছোট প্রযোজনাকে অংশগ্রহণ করার আহ্বান করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, দর্শকের জন্য টিকিটের দামও ধরা হবে নামমাত্র। আর করোনার এই সময়ে যাঁরা সম্মুখে থেকে কাজ করেছেন, যেমন চিকিৎসক, পুলিশ, সাংবাদিক প্রমুখকেও নাটক দেখতে আমন্ত্রণ জানানো হবে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির তিনটি হল—জাতীয় নাট্যশালার মূল হল, পরীক্ষণ থিয়েটার হল ও স্টুডিও থিয়েটার হল এবং বেইলি রোডের মহিলা সমিতি মিলনায়তন ঘিরেই সাধারণত মঞ্চনাটকের কাজ হয়ে থাকে। হল খোলার ব্যাপারে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা অনেক আগে থেকেই ভাবছি। নাট্যশালায় নাটক হবে, প্রতি মুহূর্তে মঞ্চ গতিশীল হবে, এটাই কামনা। তবে দর্শক হোক কিংবা নাট্যকর্মী—সবাইকেই শিল্পকলা একাডেমির ভেতরে পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। এ সবকিছু নিয়ে হল খুলে দেওয়ার ব্যাপারে আমরা মিটিং করেছি, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছি। সবকিছু মিলিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি নিশ্চিত করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।’