আলোচনা সভায় বক্তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে খুনি চক্র দেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে পরিবারের কয়েকজন সদস্য হত্যার পর খুনি চক্র ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক ধারা বদলে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষাবিদ ও গবেষকেরা। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে গতকাল বুধবার রাতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আয়োজনে ‘৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশ: বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুনর্বাসন’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে এসব মন্তব্য উঠে আসে। বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে জিয়াউর রহমানের মরণোত্তর শাস্তির জন্য একটি কমিশন গঠনের প্রস্তাবও আসে অনুষ্ঠানে। আজ বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাহ আলী ফরহাদ অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন।অনুষ্ঠানে গবেষক ও কলামিস্ট সৈয়দ বদরুল আহসান বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে ঘুরিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে বা একটা সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল খুনি চক্র। জিন্নাহর সেই দ্বিজাতি তত্ত্বই বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল তারা।’ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, লিবিয়া সরকারের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন বদরুল আহসান। বদরুল আহসান বলেন, ‘মার্কিন সরকার জানত, একটা পরিবর্তন হবে। কী পরিবর্তন…একটা ভয়াবহ পরিবর্তন হবে। আমরা জানি, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সেনাবাহিনীর অনেক কর্মকর্তা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। যাঁরা ধরা পড়েছেন, পাকিস্তানের সামরিক আদালতে তাঁদের বিচার হয়েছে।’ সৈয়দ বদরুল আহসান বলেন, ‘কিন্তু মেজর ফারুক পাকিস্তান থেকে পালিয়ে কোথায় গেলেন? তিনি গেলেন লিবিয়া, যেখানে গাদ্দাফি বলছিলেন ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের কথা। আমরা দেখি, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুনিদের লিবিয়া সরকার আশ্রয় দিয়েছিল। গাদ্দাফির গ্রিন বুক এ দেশে অনূদিত হয়। ১৯৭৪ সালে লাহোরে ওআইসি সম্মেলনে গাদ্দাফি বঙ্গবন্ধুকে বলেন, “তোমরা কেন ইসলামিক প্রজাতন্ত্র করছ না?” বঙ্গবন্ধু সে প্রস্তাব তৎক্ষণাৎ নাকচ করে দেন।’ বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে পাকিস্তানের সঙ্গে রাষ্ট্রদূত বিনিময় প্রক্রিয়া বন্ধ থাকলেও জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর তা খুলে যায় জানিয়ে বদরুল আহসান বলেন, ১৯৭৬ সালে ভুট্টো ও জিয়াউর রহমান মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন রাষ্ট্রদূত এক্সচেঞ্জ করা হোক। বাংলাদেশ থেকে পাঠানো হলো এম জহিরউদ্দিনকে, তিনি সাবেক আওয়ামী লীগার হলেও একাত্তরে তাঁর ভূমিকা বেশ প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে পাঠানো হলো পাকিস্তান আওয়ামী লীগার মি. খুরশীদকে। ক্ষমতায় থাকতে জিয়াউর রহমান, এরশাদ ও খালেদা জিয়া সবাই পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় সফর করেছেন। সেখানে তাঁরা একটি মিল খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পেছনে জিয়াউর রহমানকে ‘ছায়ামানব’ হিসেবে দেখেন মেলবোর্নের আরএমআইটির অধ্যাপক শামস রহমান। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর খুনিরা বারবার বলে গেছেন, তাঁরা জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আগে থেকে বারবার বলেছেন। কিন্তু জিয়াউর রহমানের সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে উচিত ছিল আমাদের সংবিধানকে সমুন্নত রাখা, একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা। কিন্তু তিনি তা করলেন না।’ অধ্যাপক শামস বলেন, ‘আমরা যদি পঁচাত্তরের ঘটনাবলি ধারাবাহিকভাবে দেখি ও বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাব, হি ওয়াজ আইডেন্টিফায়েড অ্যাজ আ শ্যাডো ম্যান। তিনি ছায়ার মতো পেছন থেকে সব কলকাঠি নেড়ে গেছেন।’বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকায় খন্দকার মোশতাক ও জিয়াউর রহমানের মরণোত্তর বিচারের জন্য একটি কমিশন গঠনের দাবিও জানান তিনি। অধ্যাপক শামস বলেন, ‘যদি আমরা জিয়াউর রহমান ও মোশতাককে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে না পারি, তাহলে আমরা প্রজন্মের কাছে দায়বদ্ধ থেকে যাব।’ এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৭ সালে বঙ্গবন্ধুর দুই খুনি কর্নেল খন্দকার আবদুর রশিদ ও কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান ফ্রিডম পার্টি গঠন করছিলেন। লেখক ও গবেষক হাসান মোরশেদের আলোচনায় উঠে আসে ফ্রিডম পার্টির প্রসঙ্গ। হাসান মোরশেদ বলেন, ‘ফ্রিডম পার্টির একটাই রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল, তারা দেশকে একটা ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত করতে চেয়েছিল। গাদ্দাফির ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পর আমরা ওই একই সময়ে পাকিস্তানের ভুট্টোকেও দেখতে পাই ইসলামিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে। তার ধারাবাহিকতায় এই খুনি চক্র ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশকেও ঘুরিয়ে দিতে চেয়েছিল।’দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতেও ফ্রিডম পার্টি প্রচ্ছন্ন প্রভাব রাখতে শুরু করেছিল বলে জানান হাসান মোরশেদ। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের বক্তব্যে উঠে আসে জিয়াউর রহমান কীভাবে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুরস্কৃত ও দেশান্তরী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন সেই প্রসঙ্গ।