টাকা ঢালায় গার্দিওলার সিটিকেও হারিয়ে দিয়েছে বার্সেলোনা

ইউরোপের সেরা ক্লাব কোনটি? শিরোপা জয় আর যুগে যুগে তারকা খেলোয়াড়দের উপস্থিতি মিলিয়ে ইউরোপের সবচেয়ে অভিজাত ও সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদকেই বলবে সবাই। এখন অবশ্য ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট লিভারপুলের মাথায়। কিন্তু দলবদলের বাজারে রাজা কোন ক্লাব—এই প্রশ্নটি করা হলে কাদের নাম চোখের সামনে ভেসে উঠবে? পিএসজি, ম্যানচেস্টার সিটি—সবার আগে চোখের সামনে এ দুটি ক্লাবের নামই তো ভেসে ওঠার কথা। ২০১৭ সালে দলবদলের রেকর্ড গড়ে নেইমারকে বার্সেলোনা থেকে প্যারিসে নিয়ে গেছে পিএসজি। সে মৌসুমেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড অঙ্ক দিয়ে কিনেছে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে। ম্যানচেস্টার সিটি কোটি কোটি ইউরো খরচ করে সাম্প্রতিক সময়ে রদ্রি, রিয়াদ মাহরেজ, আয়মেরিক লাপোর্তদের দলে ভিড়িয়েছে। কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে দলবদলে বিভিন্ন দলের খরচ হিসাব করলে পাওয়া যায় অন্য চিত্র। সেখানে পিএসজি-ম্যান সিটিকে পেছনে ফেলে রাজা কিন্তু বার্সেলোনা! গত কয়েক বছরে ইউরোপে সাফল্য বলতে কিছু নেই ন্যু ক্যাম্পের দলটির। কিন্তু ২০১৫ থেকে এখন পর্যন্ত ২৭ জন খেলোয়াড় কিনেছে বার্সা। সব মিলিয়ে খরচ করেছে প্রায় ১০০ কোটি ইউরো। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ও জাভি হার্নান্দেজ অবসরে চলে যাওয়ার পর হন্যে হয়ে এ দুজনের বিকল্প খুঁজছে বার্সেলোনা। ২০১৭ সালে ন্যু ক্যাম্প ছেড়ে প্যারিসে পাড়ি জমিয়েছেন নেইমারও। কাড়ি কাড়ি টাকা ঢাললেও তিনজনের মধ্যে একজনের বিকল্পও কি পেয়েছে বার্সা! ২০১৫-১৬২০১৫ সালের গ্রীষ্মটা হতে পারত বার্সার। আগের মৌসুমেই লুইস এনরিকের কোচিংয়ে ট্রেবল জিতেছে ন্যু ক্যাম্পের ক্লাবটি। ২০১৫-১৬ মৌসুমের দলবদলে ৫ কোটি ১০ লাখ ইউরো দিয়ে সেভিয়া থেকে স্প্যানিশ উইঙ্গার অ্যালেক্স ভিদাল ও অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ থেকে তুরস্কের মিডফিল্ডার আর্দা তুরানকে কেনে বার্সা। দলবদলে নিষেধাজ্ঞার জের ধরে তাঁদের কেউই ২০১৬ সালের জানুয়ারির আগে মাঠে নামতে পারেনি। কিন্তু জানুয়ারি আসতে আসতে ভিদাল চলে যান এনরিকের পরিকল্পনার বাইরে। ২০১৮ সালে আবার সেভিয়ায় ফিরে যেতে হয় তাঁকে। এর আগে বার্সেলোনার হয়ে আড়াই মৌসুমে লা লিগায় মাত্র ৩০টি ম্যাচ খেলেছেন ভিদাল। সেভিয়ায় আবার ফিরে সেখানেও থিতু হতে পারেননি। এখন ধারের চুক্তিতে আলাভেসে খেলছেন। আর তুরান? তাঁকে এখন ধরা হচ্ছে বার্সেলোনার ইতিহাসে অন্যতম বাজে চুক্তি! * ২০১৫ সালে দলবদলে বার্সার মোট খরচ: ৫ কোটি ১০ লাখ ইউরো। ২০১৬-১৭২০১৬ সালের গ্রীষ্মে বার্সেলোনা দলের অন্যতম এক সদস্যকে হারায়। ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার দানি আলভেজ মুফতে জুভেন্টাসে নাম লেখান। এনরিকে তাঁর স্কোয়াডের শক্তি বাড়াতে ১২ কোটি ৫০ লাখ ইউরো দিয়ে ছয়জন খেলোয়াড় দলে ভেড়ান। সেই ছয়জন আন্দ্রে গোমেজ, পাকো আলকাসের, স্যামুয়েল উমতিতি, লুকাস দিনিয়ে, ইয়াসপার সিলেসেন ও ডেনিস সুয়ারেজের মধ্যে বার্সায় এখন টিকে আছেন একমাত্র উমতিতি। তাও এ মৌসুমে নিয়মিত মাঠে নামা হয়নি তাঁর। গোমেজ ও দিনিয়ে এখন এভারটনে আছেন। এ থেকেই বোঝা যায় ওই গ্রীষ্মের চুক্তিগুলো একদমই ঠিক ছিল না বার্সার জন্য। * ২০১৫ থেকে ২০১৬-১৭ পর্যন্ত দলবদলে মোট খরচ: ১৭ কোটি ৬০ লাখ ইউরো। ২০১৭-১৮২০১৭ সালে ২২ কোটি ২০ লাখ ইউরো ট্রান্সফার ফিতে নেইমার বার্সা ছেড়ে চলে যান পিএসজিতে। ব্যাংক হিসাব উপচে পড়ার কারণেই হয়তো দলবদলের বাজারে পাগলের মতো খরচ করেছে বার্সা। ৩৭ কোটি ৭৫ লাখ ইউরো ঢেলে খেলোয়াড় কেনে তারা। ওসমান ডেম্বেলে ও ফিলিপে কুতিনহো ছিলেন মূল শিরোনাম। এক ডেম্বেলেকে পেতেই ১০ কোটি ৫০ লাখ ইউরো (‍শর্ত সাপেক্ষে আরও ৪ কোটি ইউরো) খরচ করেছে বার্সা। কুতিনহোকে পেতে খরচ করেছে ১২ কোটি ইউরো। সঙ্গে ছিল শর্তসাপেক্ষে আরও ৪ কোটি ইউরো। কুতিনহো গত বছর থেকেই ধারে বায়ার্ন মিউনিখে খেলছেন। এ বছর ডেম্বেলেকেও বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভাবছে বার্সা। কুতিনহো আর ডেম্বেলে ছাড়াও সেবার বার্সা দলে ভিড়িয়েছিল পাওলিনহো, নেলসন সেমেদো, ইয়েরি মিনা, জেরার্ড দেউলোফেউ ও মারলনকে। ২০১৫ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত মোট খরচ: ৫৫ কোটি ১০ লাখ ইউরো। ২০১৮-১৯ ২০১৮ সালের মধ্যে আগের চুক্তির অনেকেই বার্সেলোনা ছেড়ে যান। দেউলোফেউ, দিনিয়ে, ভিদাল, মিনা, মারলন, পাওলিনহো ও আলকাসের—এঁদের বিক্রি করে দেয় বার্সা। এ ছাড়া ২০১৮ সালে ক্লাব ছাড়েন ইনিয়েস্তাও। তাঁর বিকল্প হিসেবে আগেই ছিলেন কুতিনহো। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সামলাতে ক্লাবে যোগ দেন আর্তুরো ভিদাল ও আর্থুর মেলো। সব মিলিয়ে ২০১৮ সালের গ্রীষ্মে বার্সেলোনা দলবদলে খরচ করেছে ১২ কোটি ৯০ লাখ ইউরো। ম্যালকম ও ক্লেমেন্ত লংলের সঙ্গে দলে ভেড়ায় তারা জঁ-ক্লেয়ার তদিবোকেও (২০১৯ সালের জানুয়ারিতে)। এক মৌসুম পরেই জেনিতে নাম লেখানোর আগে লা লিগায় মাত্র ১৫টি ম্যাচ খেলেছেন ম্যালকম। আর তদিবোকে ধারের চুক্তিতে শালকেতে পাঠিয়েছে। আর্থুর তাঁর প্রতিভার বিচ্ছুরণ দেখালেও তাঁকে এ বছর বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে জুভেন্টাসে। আর জুভেন্টাস থেকে বার্সা নিয়ে এসেছে মিরালেম পিয়ানিচকে। দলবদলের বাজারে বার্সেলোনার এই অস্থিরতার মধ্যেও অবশ্য একাদশে নিজেকে নিয়মিত করে তুলেছেন লংলে। ২০১৫ থেকে ২০১৮-১৯ মৌসুম পর্যন্ত মোট খরচ: ৬৮ কোটি ১০ লাখ ইউরো ২০১৯-২০এবার ২৭ কোটি ৩০ লাখ ইউরো খরচ করে আঁতোয়ান গ্রিজমান ও ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ংকে দলে ভেড়ায় বার্সা। ৭ কোটি ৫০ লাখ ইউরোর ডি ইয়ং একাদশে নিয়মিত হলেও ১২ কোটি ইউরোতে দল আসা গ্রিজমান ন্যু ক্যাম্পে তাঁর অ্যাটলেটিকোর পারফরম্যান্সের অনুবাদ করতে পারেননি। এ মৌসুমে এ ছাড়াও মার্টিন ব্রাথওয়েট, নেতো, জুনিয়র ফিরপো, এমারসন, ত্রিনকাও ও মার্ক কুকুরেয়াকে দলে টেনেছে বার্সা। এর মধ্যে কুকুরেয়াকে বিক্রিও করে দিয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মোট খরচ: ৯৮ কোটি ৪০ লাখ ইউরো। এত এত টাকা খরচ করে লাভ কী হয়েছে বার্সার। ইনিয়েস্তা, জাভি, নেইমার—কারও বিকল্পই এখনো খুঁজে পায়নি তারা। দিতে পারেনি লিওনেল মেসির যোগ্য কোনো সঙ্গী!