দুর্নীতিবাজ কোন দলের দেখি না, ব্যবস্থা নিই: প্রধানমন্ত্রী

রোববার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে এ বিষয়ে কথা বলেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, একটা সময় দেশে যতই দুর্নীতি হোক, অন্যায়-অনিয়ম হোক, সেটা ‘ধামাচাপা’ দেওয়া হত।

“কিন্তু আমরা তা করছি না। যেখানে যেই রিপোর্ট হচ্ছে, বা যা আমরা খবর পাচ্ছি, বা যতটুকু কোথাও কোনো দুর্নীতি বা কোনো ধরনের অন্যায় হলে আমরা কিন্তু কখনো এই চিন্তা করি না যে এটা করলে এর সঙ্গে আমার দল জড়িত কিনা বা অমুম জড়িত কিনা বা পার্টির বদনাম হবে কিনা, সরকারের বদনাম হবে কিনা।

“আমি চিন্তা করি যেখানে অন্যায় হয়েছে তার বিরুদ্ধে আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। হ্যাঁ… এটা নিতে গিয়ে অনেক সময় দোষটা আমাদের উপরই এসে পড়ে। আওয়ামী লীগ সরকারই বোধহয় দুর্নীতি করছে। ঘটনা তা নয়।”

জাতির পিতাকে হত্যার পর যারা অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেছিল, তারাই এ দেশে ‘দুর্নীতির বীজ বপন করে গেছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

“প্রথমে জিয়াউর রহমান, এরপরে এরশাদ, এরপরে খালেদা জিয়া। তারা দুর্নীতিটাকে প্রশ্রয় দেওয়া শুধু না, নিজেরা দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিল এবং দুর্নীতিকে লালন পালনই করে গেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর আমরা কিন্তু সেটা কখনো করছি না।”   

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে আওয়ামী লীগ সরকার কাজ করে যাচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আপনারা নিজেরাই চিন্তা করেন, এই দেশে জঙ্গিবাদীরা নিজেরা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মিছিল করেছে, সরকারিভাবে তাদেরকে প্রটেকশন দেওয়া হয়েছে, পুলিশ পাহারা দিচ্ছে।

“আর সেই বাংলা ভাই টাংলা ভাই… এরা সব অস্ত্র সস্ত্র নিয়ে ট্রাকে করে মিছিল করে। এই ঘটনা তো আপনারা দেখেছেন। একুশে অগাস্ট গ্রেনেড হামলার পর সেই খুনিদেরকে দেশ থেকে বের হতেও দেওয়া হলে… কোথা থেকে এক জজ মিয়া নামের এক গরীব লোককে নিয়ে এসে একটা নাটক সাজানো হল।”

আওয়ামী লীগ সরকার তেমন কিছু ঘটতে দিচ্ছে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, “যেখানে দুর্নীতি পাচ্ছি… সে আমার যতবড় দলের হোক, কর্মী হোক, যেই হোক, নেতা হোক, আমরা কিন্তু সাথে সাথে ব্যবস্থা নিচ্ছি। হ্যাঁ… তাতে আমাদের বিরোধী যারা, তাদের লেখার সুযোগ হচ্ছে, বা বলার সুযোগ হচ্ছে যে আওয়ামী লীগ দুর্নীতি করছে। কিন্তু এই কথাটা কেউ চিন্তা করছে না যে আওয়ামী লীগ দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে না; সে যেই হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।”

হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “অনেকে ভেবেছিল এটা বোধহয় বাংলাদেশ একা সামাল দিতে পারবে না। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আমরা এটা সামাল দিয়েছিলাম। তারপরে যেন কখনো এই ঘটনা না ঘটতে পারে তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি।”  

শোষিত বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন সংগ্রামের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট তাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার কথাও অনুষ্ঠানে বলেন শেখ হাসিনা।

সেই হত্যাকাণ্ডের পর দেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উল্টো আদর্শে চলতে শুরু করেছিল জানিয়ে তিনি বলেন, “যে জাতি তার ইতিহাস ভুলে যায়, ত্যাগের কথা ভুলে যায়, বীরত্বের কথা ভুলে যায়, সেই জাতির উন্নতি কখনো হয় না। ২১টা বছর কিন্তু সেই অন্ধকার যুগেই বাংলাদেশের মানুষকে কাটাতে হয়েছে।

“কথাটা সবার পছন্দ নাও হতে পারে। শুধু আমি আপনাদেরকে বলব, সাংবাদিক হিসেবে আপনারা একটু তুলনা করে দেখেন। মাত্র ১১ বছর একটানা আমরা ক্ষমতায়। আর এর আগে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলাম। সেই সময় অনেকগুলো কাজ আমরা হাতে নিয়েছিলাম দেশের উন্নয়নে। যা পরবর্তীতে সম্পন্ন করে যেতে পারিনি।”

এরপর ২০০৮ এর নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০০৯ সাল থেকে আবার আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এত অল্প সময়ের মধ্যে যদি দেশে এত উন্নতি করা যেতে পারে… দারিদ্র্যের হার যদি শতকরা ৪০ ভাগ থেকে ২০ ভাগে নামানো যায়, মাথাপিছু আয় যদি বৃদ্ধি করা যায়, অবকাঠামো উন্নয়ন করা যায়, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা যায়, তাহলে ২১ বছর যারা ক্ষমতায় ছিল কেন করতে পারে নাই?

“পারে নাই সেটা না। এটা তাদের নীতির ব্যাপার ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতাটাকে ব্যর্থ করে দেওয়া। বাংলাদেশের মানুষকে অসহায় করে রাখা, দরিদ্র করে রাখা। ওই দরিদ্র হাড্ডিসার মানুষগুলোকে দেখিয়ে দেখিয়ে বিদেশ থেকে সাহায্যের নামে টাকা এনে সেই টাকা উদরস্থ করা, পকেটস্থ করা। দুর্নীতিটাকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করা।

“আর হত্যা, ক্যু, গুম, খুন থেকে শুরু করে কেউ কথা বললে তাদের উপর নির্যাতন। আর সেই নির্যাতনের শিকার আমাদের দলের লোকেরাই সব থেকে বেশি। আওয়ামী লীগের লোকেরা এবং মুক্তিযোদ্ধরাই।”

শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতাকে হত্যার পর দেশের মর্যাদা ভূলণ্ঠিত হয়েছিল, খুনিদের রক্ষায় তৎকালীন সরকার ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল,আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছিল।”

গণভবনে এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন তার মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম।

আর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে মূল অনুষ্ঠানে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ, সহ সভাপতি নজরুল কবীর, সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ চৌধুরীসহ সংগঠনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।