আমাদের ইচ্ছা ছিল, সেই সঙ্গে সীমাবদ্ধতাও অনেক

স্বাধীনতা দিবসের দুটি নাটকে কাজ করেছেন শতাব্দী ওয়াদুদ। তাঁর অভিনীত ‘মিশন এক্সট্রিম’ ছবির টিজার প্রকাশ হয়েছে সম্প্রতি। শুটিং সেরে এসেছেন ‘অপারেশন সুন্দরবন’ ছবির। কাজগুলোর অভিজ্ঞতা জানালেন এ অভিনেতা স্বাধীনতা দিবসের কোন কোন নাটকে কাজ করলেন?একটি করেছি বেসরকারি চ্যানেলের জন্য ‘কালের আবর্ত’। এটি পরিচালনা করেছেন আবু হায়াত মাহমুদ। আরেকটি করেছি বিটিভির জন্য। এটি প্রযোজনা করেছেন আবু তৌহিদ মোল্লা। ‘কালের আবর্ত’ নাটকে আপনার চরিত্র সম্পর্কে বলুন। এর আগে এমন চরিত্রে অভিনয় করেছেন? এ নাটকে আমি রাজাকারের চরিত্রে অভিনয় করেছি। রাজাকারের চরিত্র আগেও করেছি। তবে সেগুলো গ্রামের রাজাকার। শহরকেন্দ্রিক রাজাকারের চরিত্র করিনি। এ নাটকের গল্প পুরান ঢাকার একটা পতিতাপল্লির। তিশা অভিনয় করেছেন সেখানকার একটি চরিত্রে। আমি নিয়মিত সেখানে যাই। সমাপ্তি মাসুকের সঙ্গে সম্পর্ক থাকে তিশার। যুদ্ধ লাগলে সেখানকার মেয়েরা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করে। আমি পতিতাপল্লি দখল করে মেয়েদের ওপর নির্যাতন চালাই। জায়গাটাকে পাকিস্তানি আর্মির ক্যাম্প বানাই। টর্চার সেল হয়ে ওঠে পল্লিটা। নাটকে আমার চরিত্রে যথেষ্ট হিংস্রতা আছে। গ্রামের রাজাকারের চরিত্রে এত হিংস্রতা থাকে না। এখানে আমার চরিত্রের নাম আলমাস। বিটিভির নাটকটিতে আপনার চরিত্র কেমন?এখানে আমি মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে অভিনয় করেছি। আমার চরিত্রের নাম মজনু। গ্রামের সহজ–সরল একটা লোক আমি। বউ কথা শোনায় তাকে। ভাত দেওয়ার সময় খোঁটা দেয়। তার মধ্যে কোন সাড়া পাওয়া যায় না। দেশ, মাটি নিয়ে যে বড় চিন্তা করে না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার তেমন ভাবনা নেই। স্বাধীনতার সময় একসঙ্গে সবার বোধ জাগ্রত হয়নি। কারও আগে হয়েছে কারও পরে হয়েছে। আমার চরিত্রটি এমন যুদ্ধের শুরুতে, যার ভেতরে কিছু কাজ করেনি। যখন তার সন্তানের স্কুল জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, তখন তার মধ্যে পরিবর্তন ঘটে। অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে। এক নাটকে রাজাকার, আরেক নাটকে মুক্তিযোদ্ধা। একেবারে বিপরীতমুখী চরিত্র। কীভাবে রূপায়ণ করেন চরিত্রগুলো!আমাদের দেশের অভিনয়ের জগৎটা সীমাবদ্ধ। বৈচিত্র্যপূর্ণ চরিত্র খুব বেশি পাওয়া যায় না। তাই তেমন চরিত্র পেলে সেই সুযোগ নষ্ট করতে চাই না। বিপরীত ধরনের চরিত্র পেলে নিজের উত্তরণ ঘটানোর সুযোগ পাওয়া যায়। স্বাধীনতা দিবসের কাজগুলো করার সময় বিশেষ কোনো অনুভূতি কাজ করে কি?সব চরিত্রই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তারপরও মুক্তিযুদ্ধের কাজ করতে গেলে একটু অন্য রকম অনুভূতি তো হয়ই। আমি মুক্তিযুদ্ধের পরের প্রজন্ম। যুদ্ধ দেখিনি আমি। এই কাজগুলো করতে গেলে মনে হয়, যুদ্ধের একটা অংশ হতে পেরেছি। ‘মিশন এক্সট্রিম’–এর টিজার বেরিয়েছে। এ ছবিতে আপনি অভিনয় করেছেন। কেমন সাড়া পেয়েছেন?অনেক ভালো সাড়া পেয়েছি। ছবি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে আমি খুবই আশাবাদী। এতে আপনার চরিত্র কি পুলিশ অফিসারের?পুলিশ অফিসার, কিন্তু চরিত্র সম্পর্কে কিছুই বলা যাবে না। চমক আছে দর্শকদের জন্য। নেতিবাচক কোনো চরিত্র কী?না, নেতিবাচক নয়। তবে চমকপূর্ণ। ‘অপারেশন সুন্দরবন’–এ আপনার চরিত্র কী?এখানে আমি মনা ডাকাতের চরিত্র করছি। সে জলসদ্যুদের সরদার। এটা কি সত্যিকারের চরিত্র?না, পুরোপুরি সত্যি চরিত্র নয়। আবার পুরোটা কল্পনাও নয়। এটা কল্পনা ও বাস্তবের মিশেলে ভয়ংকর একটা চরিত্র। মনাকে কেউ কখনো দেখেনি। সে বাঘের সঙ্গে লড়াই করেছে। এমন নানা মিথ আছে তাকে ঘিরে। এক ছবিতে পুলিশ, আরেক ছবিতে ডাকাত। বিপরীতমুখী চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ নিশ্চয়ই বেশি? এটা নির্মাতারা আমার ওপর ভরসা করছেন বলেই পারছি। যেকোনো চরিত্র করার জন্যই আমি প্রস্তুত। ‘অপারেশন সুন্দরবনে’ কাজের অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই অন্য রকম?অবশ্যই। দুর্গম অঞ্চলে কাজ করেছি আমরা। জোয়ার–ভাটা, গরম–ঠান্ডা মিলিয়ে বিরূপ পরিস্থিতি। দুটি জাহাজেও লোক ধরেনি। থাকতে হয়েছে ট্রলারে। ১৫০ জনের বিশাল ইউনিট। খাবার পানির সংকট ছিল। অনেক পরিশ্রম করে কাজ করেছেন সবাই। ‘ঢাকা অ্যাটাক’–এর ইউনিট ভেঙে ‘মিশন এক্সট্রিম’ ও ‘অপারেশন সুন্দরবন’ এই দুটি ইউনিট হয়েছে। দুই ইউনিটেই আপনি আছেন। এর রহস্য কী!আমি আছি, তাসকিনও আছে। আরও কয়েকজন আছেন। দুটি ছবিই অত্যন্ত পরিশ্রম করে নির্মিত হচ্ছে। অন্য ছবির মতো এগুলোতে কোনো আপস করা হচ্ছে না। আমরা যা–ই বলি, দিন শেষে যদি দর্শকের কাছে ছবির উপস্থাপনা পছন্দ না হয়, তবে দর্শক ছবি দেখবেন না। আমাদের সব চেষ্টা বৃথা। দুটি ছবিই সিরিয়াসলি তৈরি করা হয়েছে। দর্শক পছন্দ করবেনই। ‘আয়নাবাজি’, ‘দেবী’, ‘ঢাকা অ্যাটাক’ দর্শক কেন দেখেছেন? কারণ, ছবিগুলো তাঁরা উপভোগ করেছেন। ‘মিশন এক্সট্রিম’ ও ‘অপারেশন সুন্দরবন’ দেখেও দর্শক বিনোদিত হবেন। আপনি সাধারণ মানের বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করেছেন। ‘ঢাকা অ্যাটাক’, ‘অপারেশন সুন্দরবন’ মানের ছবিতেও কাজ করছেন। পার্থক্য পেয়েছেন কোথায়?একটা ছবি আমরা দেখি পরিচালকের চোখ দিয়ে। তাঁরই দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায় ছবিতে। সমাজে কোনো সন্তান প্রতিষ্ঠা পায়, কোনো সন্তান বখে যায়। মা–বাবার ভাবনার কারণে, চিন্তার কারণে সন্তান নানা রকম হয়। বাণিজ্যিক ছবিও তা–ই। যে ছবির প্রস্তুতি ভালো থাকে, সে ছবিটা ভালো হয়। দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়। কাজের বাইরে অন্য প্রসঙ্গে যাই। আমাদের নাটক নিয়ে আক্ষেপ আছে। সিনেমার গতি নিচে ধাবমান। শোবিজের অবস্থা ভালো নয়। এসব কিছুতে কি শিল্পীর ব্যক্তিজীবন প্রভাবিত হয়?আমার ক্ষেত্রে বলব, আমার বয়স বেড়ে যাচ্ছে। এখন আমি যে চরিত্রগুলো করতে পারব, বয়স হয়ে গেলে সেগুলো আমি করতে পারব না। আমাদের ইচ্ছা ছিল, সেই সঙ্গে সীমাবদ্ধতাও অনেক। এ নিয়ে ভেতরে একটা টানাপোড়েন চলে। পাশের দেশে কত ভালো ভালো কাজ হচ্ছে। আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। এদিকে বয়স থেমে নেই আমার। মনে হয় কোথাও গিয়ে অবক্ষয়টা থামবে। অবক্ষয়ের উত্তরণ ঘটবে। এ স্থবিরতা কাটবে। আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আমি আশাবাদী। নতুনদের হাত ধরে পরিবর্তন আসবে। করোনায় গৃহবন্দী নিশ্চয়ই?আমি ঘরবন্দী অবস্থায় আছি। আমরা খুব উদাসীন করোনা নিয়ে। এটাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতোই সিরিয়াসলি নেওয়া উচিত সবার। কেন জানি না, সিরিয়াসনেস আমাদের কম। অবসর পেয়েছেন। কী করছেন?সন্তানকে সময় দিচ্ছি। সব খারাপ জিনিসের হয়তো ভালো দিক থাকে। করোনার ভালো দিক হয়তো এটাই। সন্তানকে কখনো সময় দিতে পারিনি সেভাবে। এখন সন্তানকে সঙ্গ দিতে পারছি। যে সময়টা আমি বাইরে থাকি, তখন সে কীভাবে সময় কাটায়, এটা জানতে পারছি।