সেই রাতের বীভৎসতা যোদ্ধা বানিয়েছিল এক গোলরক্ষককে

ষাটের দশকে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের তারকা গোলরক্ষক ছিলেন খোন্দকার নূরুন্নবী। ২৫ মার্চ কালরাতের নৃশংসতা তাঁকে বদলে দিয়েছিল। মাতৃভূমির অপমান তাঁকে বানিয়েছিল দুর্ধর্ষ এক যোদ্ধায়। সে রাতটি ছিল নিকষ কালো। বিপর্যয়ের সে রাতটিতে ঢাকার আকাশে প্রতিধ্বনি হয়েছিল বাঙালির হাহাকার। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে অবর্ণনীয় নৃশংসতা নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এ দেশের মুক্তিকামী মানুষের ওপর। এক রাতেই তারা হত্যা করেছিল হাজার হাজার ঘুমন্ত, নির্বিরোধী বাঙালিকে। সে রাতের ভয়াবহতার হাত থেকে রেহাই পাননি কেউই, সাধারণ শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, সাধারণ পেশাজীবী—সবাই সেদিন মুখোমুখি হয়েছিলেন অচিন্তনীয় অভিজ্ঞতার। আগুনের লেলিহান শিখা আর রক্ত সেদিন বিদ্রোহী করে তুলেছিল সবাইকে। নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্নে সেদিনই দেশমাতৃকার মুক্তির শপথ নিয়েছিলেন বাঙালিরা। খেলার মাঠের মানুষেরা রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরেই থাকেন সাধারণত। সবুজ মাঠের খেলোয়াড়েরাও সে রাতের তাণ্ডব থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারেননি। ঢাকা স্টেডিয়ামের বারান্দায় সে রাতে পড়েছিল বাঙালিদের লাশ। মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় রাতে ঘুমিয়ে থাকা মানুষেরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুলির মুখে পড়েছিলেন। সে রাতের গণহত্যা সেদিন খেলার মাঠের অনেককেই প্রত্যয়ী করে তুলেছিল নিজ জাতির মুক্তিসংগ্রামে। ষাটের দশকে ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের কৃতি গোলরক্ষক খোন্দকার নূরুন্নবী ছিলেন তেমন অনেক ক্রীড়া সৈনিকের একজন। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ৯ মাস দেশের জন্য রণাঙ্গনেই লড়েছিলেন এই কৃতি ফুটবলার। মুক্তিযুদ্ধ তাঁকে বদলে দিয়েছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর খেলার মাঠে না ফিরে তিনি যোগ দিয়েছিলেন সদ্য স্বাধীন দেশের সেনাবাহিনীতে। মাঠের আড্ডা দর্শকদের ভালোবাসা আর তারকাখ্যাতিকে তুচ্ছ করেছিলেন দেশের জন্য। পরবর্তীকালে সেনাবাহিনীর চাকরিতে সফল হয়ে পৌঁছেছিলেন সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে। মেজর জেনারেল হিসেবে শেষ করেছিলেন তাঁর সফল সেনা-ক্যারিয়ার। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে খোন্দকার নূরুন্নবী চলে গেছেন এ পৃথিবী ছেড়ে।তাঁর লেখা বই ‘ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে সেক্টর আটে’ তিনি ২৫ মার্চের ভয়াল রাতের নৃশংসতার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি সেদিন চোখের সামনে দেখেছিলেন পাকিস্তানিদের নিধনযজ্ঞ। গরিব-ছিন্নমূল মানুষের মৃতদেহ। অপমান আর অবরুদ্ধ ক্ষণ তাঁকে সেদিন করে তুলেছিল বিদ্রোহী। ফুটবল যে জীবনের চেয়ে অনেক বড়, সেদিন নূরুন্নবী খুব ভালোমতোই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।তাঁর বইয়েরই আছে আড্ডাপ্রিয় নূরুন্নবী ২৫ মার্চ অনেক রাত পর্যন্তই কাটিয়েছিলেন ঢাকা স্টেডিয়ামের প্রিয় আঙিনায়। সতীর্থ খেলোয়াড় আর বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডাই দিয়েছেন তিনি। রাজনীতির খবর রাখতেন, কিন্তু অতটা সচেতনতা ছিল না। সেদিন অনেক রাত পর্যন্তও ভাবতে পারেননি কী এক মনুষ্য-সৃষ্ট দুর্যোগ সওয়ার হচ্ছে বাঙালির জীবনে। ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই শুরু হয়ে যায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’। বুলেট, বোমা আর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ঝনঝনানি তাঁকে বুঝিয়ে দেয় শত্রু দ্বারা আক্রান্ত তাঁর প্রিয় স্বদেশ।পঁচিশে মার্চের পর ঢাকায় তাঁর সঙ্গে থাকা ছোট ভাইকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বন্ধু, মোহামেডান ক্লাবের সতীর্থ প্রতাপ শংকর হাজরার বাড়িতে। কিন্তু সেখানেও রেহাই মেলেনি। ২৮ মার্চ প্রতাপ হাজরার বাড়ি আক্রমণ করে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে তাঁর ভাই ও বন্ধু প্রতাপ হাজরা বেঁচে গেলে এই আক্রান্ত বন্ধু-পরিবারকে বাঁচাতে তিনি প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালান একটি নিরাপদ আশ্রয়ের। বন্ধু-পরিবারটিকে তিনি ভারতের আগরতলায় নিয়ে যান মে মাসে। সেখান থেকে কলকাতা গিয়ে তাঁর দেখা হয় পাকিস্তান জাতীয় দলের সতীর্থ মেজর হাফিজউদ্দিনের সঙ্গে। মেজর হাফিজকে পেয়ে খোন্দকার নূরুন্নবীর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার বাসনা পূরণ হয়।সেখান থেকে তিনি যান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম যুদ্ধকালীন প্রশিক্ষণ শিবিরে। প্রশিক্ষণ শেষে সেনাবাহিনীর একজন গর্বিত সদস্য হিসেবে সেক্টর আটের অধীনে কুষ্টিয়া অঞ্চলে তিনি অস্ত্র হাতে নেমে পড়েন মাতৃভূমির মুক্তিযুদ্ধে। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে তিনি রাখেন অসামান্য ভূমিকা।একটা রাতই বদলে দিয়েছিল একজন খেলোয়াড়ের জীবন। ফুটবল মাঠের গোলরক্ষক, পরিণত হয়েছিলেন দুর্ধর্ষ এক যোদ্ধায়। এমন ইতিহাস তো পৃথিবীতেই বিরল!