একবার জটে পড়লে বছর বছর ঘুরেও হচ্ছে না কাজ

পাসপোর্ট সংশোধনের জন্য দুই বছর আগে আবেদন করেছিলেন ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্রী ফাতিমা কবির মারইয়াম। এ লেভেল, ও লেভেল পরীক্ষার জন্য তাঁর এই পাসপোর্ট দরকার। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ঘোরাঘুরি করেও কোনো ফল পাননি তিনি।

পাসপোর্ট সংশোধন করতে তাঁর মতো দীর্ঘ ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে বহু মানুষকে।
এ নিয়ে হতাশ পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তারাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাসপোর্টের আঞ্চলিক অফিসের একজন সহকারী পরিচালক প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই জটের কারণে আমরাও হয়রানির শিকার হচ্ছি। দিনে এত অভিযোগ শুনতে হয়! সাক্ষাৎ করতে করতে কাজের সময় নাই।’

পাসপোর্ট সংশোধনের কাজ হয় রাজধানীর উত্তরায় ই–পাসপোর্ট অফিসে। পাসপোর্ট সংশোধনের জন্য সেখানে প্রতিদিন যেসব আবেদন পড়ে, সেগুলো প্রথমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম্পিউটারে পরীক্ষা হয়। তাতে দেখা যায়, বিভিন্ন জটিলতার কারণে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার আবেদন আটকে যায়। এদিকে এসব আবেদন যাচাই–বাছাইয়ে কাজ করেন ১০ জন কর্মকর্তা। তাঁরা দিনে হাজারখানেক আবেদনের সুরাহা করতে পারেন। ফলে প্রতিদিনই প্রায় ৫০০–এর মতো আবেদন থেকে যায়।

আর একবার এই প্রক্রিয়ায় আটকা পড়লে, তা সুরাহা হতে দিনের পর দিন চলে যায়। কিন্তু অগ্রাধিকারের তালিকায় পেছনে পড়ে সেই আবেদনের ই-পাসপোর্ট আর মেলে না। এভাবে বছর দেড়েকের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার আবেদন আটকা পড়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করলে বা আগের পাসপোর্ট অনুযায়ী নবায়ন করলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই পাসপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বিপত্তি বাধছে ওই সংশোধনে। বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন তাঁরাই, যাঁদের বড় ধরনের সংশোধন দরকার।

ফাতিমা কবির মারইয়ামের ঘটনাটা তেমনই। কয়েক দিন আগে পাসপোর্ট অফিসে দেখা হয় তাঁর সঙ্গে, সঙ্গে ছিলেন তাঁর মা–ও। ফাতিমা কবির মারইয়াম বলেন, মা–বাবার বিচ্ছেদের কারণে তিনি দীর্ঘদিন মামা–মামির সঙ্গে ছিলেন। ২০১৪ সালে পাসপোর্ট করার সময় তাঁর বয়স ছিল ১৩ বছর। তখন মামা–মামি তাঁর পাসপোর্ট করে দেন। মা–বাবার নামের জায়গায় তাঁদের নিজেদের নাম বসিয়ে দেন। তাঁর নামও কিছুটা পরিবর্তন হয় সেখানে।

পরবর্তী সময়ে ফাতিমা কবির মারইয়ামের জন্মদাতা মা–বাবা তাঁদের সন্তানকে জাতীয় পরিচয়পত্র করিয়ে দেন। সেখানে মা–বাবার নামের জায়গায় সঠিক নাম ব্যবহৃত হয়। এরপর ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে পাসপোর্ট সংশোধনের আবেদন করেন ফাতিমা কবির মারইয়াম। পরিবর্তন আসে তিনটি—নিজের নাম, মা ও বাবার নাম। কিন্তু দীর্ঘদিন ঘোরাঘুরি করেও তিনি আর নতুন পাসপোর্ট পাননি।

ফাতিমা কবির মারইয়াম প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রথমে জাতীয় পরিচয়পত্র, তারপর জন্মসনদ, সিটি করপোরেশন থেকে প্রত্যয়নপত্র—যা যা চেয়েছিল, সবই দিয়েছি। তখন একটা বছর ঘুরেছি পাসপোর্টের দুটি বিল্ডিংয়ে। কোনো সমাধান হয়নি।’

ব্যর্থ হয়ে একপর্যায়ে নিরাশ হয়ে পড়েন ফাতিমা কবির মারইয়াম। ২০১৯ সালের শেষ দিকে পাসপোর্ট সংশোধন নয়, নবায়ন করেন তিনি। করোনা পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ায় এক বছর পর আবার চেষ্টা চালাচ্ছেন জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী পাসপোর্ট তৈরি করার জন্য। ফাতিমা কবির মারইয়াম বলেন, ‘আমার পড়াশোনা ঠিকমতো করতে হবে। আমি বাসায় বসে এ লেভেল, ও লেভেলের সিলেবাস শেষ করেছি। এখন পাসপোর্ট দিলেই এ লেভেল, ও লেভেল পরীক্ষা দিতে পারব।’

মারইয়ামকে বলা হয়েছে প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র নিয়ে আসতে। তিনি হয়তো এবার সংশোধনের প্রক্রিয়ায় যাবেন। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যেই আটকে আছেন অনেকে।

পাসপোর্ট প্রিন্ট, সংশোধনসহ ই–পাসপোর্টের সব কাজ হয় উত্তরা ই–পাসপোর্ট অফিসে। দুই ধাপে এখানে প্রতিটি আবেদনের পরীক্ষা হয়। প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা হয় আগের পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মসনদের সঙ্গে আবেদনের মিল আছে কি না। কোনো গরমিল থাকলে তখন আটকে দেয় সফটওয়্যার।

এরপর এবিস বা স্বয়ংক্রিয় বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ পদ্ধতিতে পরীক্ষা হয়। অন্যের তথ্যের সঙ্গে মিলে গেলে, আইরিশ, আঙুলের ছাপ ও চেহারা মিলে গেলে, কিংবা অন্যের নাম ব্যবহার করলে তা ধরে শনাক্ত করে ফেলে সফটওয়্যার। মূলত আবেদনের সময় আগের পাসপোর্টের তথ্য গোপন করলে এমনটা হয়। এখানে গরমিল দেখা গেলে পরবর্তী ধাপের জন্য অনুমোদন না দিয়ে আবেদনটি ঝুলিয়ে রাখে সফটওয়্যার। এই ঝুলিয়ে রাখাকে বলে ‘এবিস চেক পেন্ডিং’।

কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে চালুর পর থেকে প্রাথমিক পরীক্ষায় আটকে যাওয়া ২৫ হাজার আবেদন পড়ে আছে। আর এবিস চেক পেন্ডিংয়ে ঝুলে আছে প্রায় পাঁচ হাজারের মতো আবেদন।

এই দুই ধাপ পার হওয়ার পর আবেদনটি সংশোধিত পাসপোর্টের জন্য চলে যায়। আর যে আবেদনগুলো আটকে যায়, সেগুলো নিয়ে কাজ শুরু করেন কর্মকর্তারা।

কর্মকর্তারা পরবর্তী সময়ে এসব তথ্য যাচাই–বাছাই করেন। সমস্যার ধরন বুঝে তথ্য সংশোধনের সুযোগ দেন বা আবেদন বাতিল করেন। এই বাতিল করে দেওয়াকে বলে ‘এবিস চেক ফেইলড’।

ই–পাসপোর্টের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ই–পাসপোর্ট শুরুর পর এখন পর্যন্ত দুই থেকে তিন হাজার আবেদন বাতিল হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এ ধরনের কেস (ঘটনা) মূলত ইতালিসহ আরও কিছু দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের। পাসপোর্টের তথ্য লুকানো অপরাধ। কেউ না জেনে তথ্য লুকালে তখন সংশোধনের সুযোগ দিই। ক্রিটিক্যাল কেস হলে বাতিল করে দিই।’

সংশোধনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝামেলা হচ্ছে নামের প্রথমে মোহাম্মদ নিয়ে। জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মসনদে যাঁদের নামের আগে ‘মো.’ বা ‘মোহা.’ ছিল, আগে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট করার সময় সেখানে শুধু ‘মোহাম্মদ’ রাখার বিধান ছিল। সেই বিধান এখন আর নেই। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী যাঁর নামের আগে যেটা লেখা আছে, সেটাই থাকছে। তবে সফটওয়্যারে বিষয়টি এখনো হালনাগাদ না করায় এ জন্য ভুল ধরে আবেদন আটকে দেওয়া হচ্ছে।

পাসপোর্ট সংশোধনের আবেদন করলেই ওই সমস্যার কারণে আটকে দিচ্ছে সফটওয়্যার। এ ছাড়া মা–বাবা, আবেদনকারীর জন্মতারিখ, জন্মস্থান ও স্থায়ী ঠিকানা সংযোজন–বিয়োজনের ক্ষেত্রেও সফটওয়্যারে আটকে যাচ্ছে আবেদনগুলো।
সরকার ‘তথ্য সংশোধনপূর্বক দেশে ও বিদেশে পাসপোর্ট রি–ইস্যুর আবেদনসমূহ নিষ্পত্তিকরণ’–সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করে ২০২১ সালের ২৮ এপ্রিল। পরিপত্র অনুযায়ী, বয়স পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের ব্যবধান পর্যন্ত বিবেচনা করা যাবে। কিন্তু দেখা গেছে, অনেকেই ১০ বছর পর্যন্ত বয়স পরিবর্তনের আবেদন করেছেন। তাতে প্রাথমিক পরীক্ষায়ই আটকে যাচ্ছে আবেদনগুলো।

আটকে যাওয়া নথিগুলো সমাধান করেন পাসপোর্টের কর্মকর্তারা। এরপর আবেদনকারীকে প্রয়োজনীয় নথিপত্রগুলো পাসপোর্ট অফিসে জমা দিতে বলা হয়। সেগুলো হাতে পেলে মিলিয়ে দেখেন কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ূব চৌধূরী বলেন, নথি মিলিয়ে পরীক্ষা করতে গেলে পুরো তথ্য আবার খতিয়ে দেখতে হয়। সন্দেহ হলে পুলিশের বিশেষ শাখা ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা হয়।

মোহাম্মদ আইয়ূব চৌধূরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘(আটকে যাওয়া পাসপোর্ট) এত বেশি যে চেষ্টা করেও কমাতে পারছি না। তাই তথ্যের সংশোধন হলে দেরি হতে পারে।’
সমস্যার সমাধানে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে ই–পাসপোর্ট অফিসের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই মাসের মধ্যে এই জট ১০ হাজারে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা আছে। এ ক্ষেত্রে শিফটে কাজ করা হবে।’

পাসপোর্ট সংশোধনের আবেদন দীর্ঘদিন ঝুলে থাকায় চাপ বাড়ছে পাসপোর্টের আঞ্চলিক অফিসের কর্মকর্তাদের ওপর। আবেদনের সর্বশেষ অবস্থান জানতে, দ্রুত পেতে কর্মকর্তাদের কামরায় প্রতিনিয়ত ভিড় করেন ভুক্তভোগীরা।

অনেক সময় যাঁদের পাসপোর্ট দ্রুত হাতে পাওয়া দরকার, তাঁদের আবেদনের নম্বর লিখে ই–পাসপোর্ট কর্মকর্তাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পাঠান দ্রুত সমাধানের জন্য। কিন্তু সেগুলোর কোনো সমাধান না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েন এসব কর্মকর্তা।