যে লজ্জার কথায় লাল হয়ে যায় পাকিস্তান

শারজায় সে দুই দিন বেশ গরম পড়েছিল। অবিশ্বাস্য মনে হলেও একপর্যায়ে ৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যেও টেস্ট খেলেছে দুই দিন। তবে সে তাপে পুড়ে অঙ্গার হয়েছিল শুধু পাকিস্তানই।

২০০২ সালের পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার সিরিজটি এমনিতেও অদ্ভুত ছিল। শ্রীলঙ্কা দলের ওপর হামলা তারও সাত বছর পরের ঘটনা। তবু নিরাপত্তার শঙ্কায় সেবার ঘরের সিরিজ পরের মাঠেই খেলতে হয়েছিল পাকিস্তানকে। সেটাও কত নাটকীয় ঢঙে!

সিরিজের প্রথম টেস্ট হলো কলম্বোর পি সারা ওভালে। পরের দুই টেস্টের জন্য শুধু ভেন্যুই বদলাল না, দেশও পাল্টে গেল! ওড়াল দিয়ে দুই দল হাজির হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতে। শারজায় প্রথম ম্যাচে যা ঘটল, তাতে পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসে রচিত হলো অনাকাঙ্ক্ষিত এক অধ্যায়।

কেউ চোটে পড়েছিলেন, কেউবা এমনিই বাদ পড়েছিলেন। ফলে পরিচিত মুখদের মধ্যে সাঈদ আনোয়ার, ইনজামাম-উল-হক, মোহাম্মদ ইউসুফ, শহীদ আফ্রিদি—তাঁরা কেউই ছিলেন না। এমন ভগ্নশক্তির ব্যাটিং আর আনকোরা সব মুখ নিয়েই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নেমেছিল পাকিস্তান। তবু এমন কিছু হবে, কে ভাবতে পেরেছিল!

১১ অক্টোবর সকালে টসে জিতে ব্যাটিং বেছে নিয়েছিলেন অধিনায়ক ওয়াকার ইউনিস। দুর্বল ব্যাটিং লাইনআপ হলেও বোলিংয়ে কোনো দুর্বলতা ছিল না। ইউনিস নিজে আছেন, আছেন আগের টেস্টেই দুর্দান্ত বোলিং করা শোয়েব আখতার। অলরাউন্ডার আবদুল রাজ্জাক তো ছিলেনই। আর স্পিন আক্রমণে অফ স্পিনার সাকলায়েন মুশতাক ও লেগ স্পিনার দানিশ কানেরিয়া। শারজার উইকেটে চতুর্থ ইনিংসে পাকিস্তানের স্পিনারদের দাপটে ম্যাচ বের করে নেওয়ার একটা আশা তো ছিলই।

কিন্তু চতুর্থ ইনিংস বলে কিছু তো থাকতে হবে! শুরুটাই হলো ভয়ংকর। গ্লেন ম্যাকগ্রার প্রথম ওভারের শেষ বলেই ক্যাচ দিয়ে ফিরে আসেন ইমরান নাজির। পরের ওভারে প্রথমেই নো দিলেন ব্রেট লি। কিন্তু পরের বলেই সেটা পুষিয়ে দিলেন তৌফিক উমরের স্টাম্প উপড়ে নিয়ে। শূন্য রানে দুই ওপেনারের ফেরা যে বার্তা দিল, সেটা ভুল প্রমাণিত হয়নি। এক প্রান্ত ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন আবদুল রাজ্জাক। কিন্তু ২১ রান করে শেন ওয়ার্নের বলে ফিরলেন তিনিও। পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ ততক্ষণে ধ্বংসস্তূপ। ৪৬ রানে পড়ে গেছে ৬ উইকেট। রান ৪৬ থেকে নড়ার আগেই পড়ল সপ্তম উইকেট। ৫০ রান হতেই পড়ল নবম উইকেট।

কানেরিয়ার লড়াই দলকে আরও ৯টি রান এলে দিলেও সর্বনাশ এড়ানো যায়নি। ৫৯ রানে অলআউট হয়ে নিজেদের ইতিহাসের সর্বনিম্ন রানের রেকর্ড গড়ল পাকিস্তান। ২ উইকেট পেতে ১৫ রান খরচ করা ব্রেট লি অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে খরুচে। আর ১১ ওভারে ১১ রান দিয়ে ৪ উইকেট পেয়ে সেরা বোলিং শেন ওয়ার্নের।

শারজার তীব্র গরমে অস্ট্রেলিয়াও যে খুব দুর্দান্ত ব্যাট করেছে, তা নয়। জাস্টিন ল্যাঙ্গার, রিকি পন্টিং ও ডেমিয়েন মার্টিনরা থিতু হয়ে ইনিংস বড় করতে পারেননি। সবাই চল্লিশের আশপাশে আউট হয়েছেন। তবে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে যা করা দরকার, সেটা ম্যাথু হেইডেনই করেছেন। অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতেও ২৫৫ বল টিকে রইলেন। ১১৯ রানের ইনিংসে দলকে এনে দিলেন ২৫৯ রানের অগ্রগামিতা।

২৫১ রানে পিছিয়ে থাকা পাকিস্তানের শুরুটা হলো ভয়ংকর। এবারও প্রথম ওভারের শেষ বলে উইকেট হারাল পাকিস্তান। তবে প্রথম ইনিংসের চেয়ে চিত্রনাট্য একটু বদলাল। ইমরান নাজির একটি বল ঠেলে দিয়েছিলেন পয়েন্টে। সেটা পন্টিং ঠিকভাবে ধরতে পারেননি দেখে দৌড় দিয়েছিলেন অন্য প্রান্তে থাকা উমর। নাজির যখন তাঁকে ফেরত পাঠালেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। পাকিস্তানের কপাল পুড়ল ক্ষণিক পরই, যখন আহত হয়ে মাঠ ছাড়লেন রাজ্জাক।

কারণ ভিন্ন হলেও মাঠ ছাড়ার ক্ষেত্রে রাজ্জাককে অনুসরণ করতে কোনো দ্বিধা করেননি ইউনিস খান, ইমরান নাজির, মিসবাহ-উল-হক। তবু ৫ উইকেটে ৫০ রান তুলে ফেলেছিল পাকিস্তান। এরপরই শেন ওয়ার্নের আঘাত। একে একে তুলে নিলেন ফয়সাল ইকবাল, শোয়েব আখতার ও ওয়াকার ইউনিসকে। মাঝের ওভারে ব্রেট লিও তুলে নিলেন সাকলায়েন মুশতাককে। ৫৩ রানে নবম উইকেট হারালেও পাকিস্তান অলআউট বলেই মেনে নেওয়া হলো। চোট পেয়ে মাঠ ছাড়া রাজ্জাকের আর ফেরার সম্ভাবনা ছিল না। নিজেদের ইতিহাসের সর্বনিম্ন রানের রেকর্ড আবার গড়ল পাকিস্তান।

দ্বিতীয় ইনিংসেও ৪ উইকেট পেয়েছিলেন ওয়ার্ন, এবার ১৩ রানে। ২৪ রানে ৮ উইকেট পাওয়ার পরও ম্যাচসেরা হতে পারেননি তিনি। সেটি গেছে ম্যাথু হেইডেনের কাছে। অবশ্য সেটাই হওয়ার কথা। দুই ইনিংস মিলিয়ে পাকিস্তান যে রান করেছে, সেটা হেইডেনের চেয়ে ৭ রান কমছিল। টেস্ট ইতিহাসেই দুই ইনিংস মিলিয়ে এত কম রান নেওয়ার রেকর্ড মাত্র তিনটি। এর কোনোটিই ১৯৫০ সালের এদিককার ঘটনা নয়।

আজ থেকে ১৯ বছর আগের এ দিনেই দুই দিনের মধ্যে নিজেদের সর্বনিম্ন রানের রেকর্ড দুবার ভাঙার রেকর্ড গড়েছিল পাকিস্তান। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি বহুকাল ধরে লজ্জায় ফেলে দেবে পাকিস্তান ক্রিকেটকে।