করোনা প্রতিরোধে গোটা সরকার যুক্ত

কোভিড–১৯ রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ‘গোটা’ সরকারব্যবস্থা কিছুটা বিলম্বে হলেও যুক্ত হয়েছে। সাধারণ ছুটি, সন্দেহভাজনদের কোয়ারেন্টিনে (সঙ্গনিরোধ) রাখাসহ সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ জোরালোভাবে জারি রাখা দরকার। এগুলো প্রতিনিয়ত মূল্যায়নের মাধ্যমে সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জগুলো দ্রুত দূর করতে হবে। এমন অভিমত সরকারি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের। দেশে এখন সাধারণ ছুটি চলছে। মানুষ থেকে মানুষকে দূরে রাখতে, জনসমাগম রহিত করতে এ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। ২৬ মার্চ শুরু হওয়া ছুটি ১১ এপ্রিল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। ছুটির পাশাপাশি দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা আরোপ করেছে সরকার। এটা কার্যকর করতে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন তৎপর আছে। তাদের সহায়তা করছে স্থানীয় পুলিশ। মূল উদ্দেশ্য ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ করা। করোনাভাইরাসের প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এখন শুধু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সক্রিয় নয়। কমপক্ষে ১০টি মন্ত্রণালয় এ কাজে যুক্ত হয়েছে। ৩১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের কোভিড–১৯ পরিস্থিতি নিয়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকেরা ছাড়াও এতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা যুক্ত হন। এ ছাড়া এ কাজে যুক্ত আছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, আইসিটি মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হওয়া ব্যক্তিবর্গ ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এটাই প্রমাণ করে যে গোটা সরকারব্যবস্থা কোভিড–১৯ প্রতিরোধে সার্বিকভাবে যুক্ত হয়েছে।’ কোভিড–১৯ বিষয়ে একাধিক কমিটি আছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি জাতীয় কমিটি আছে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি আছে। একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ (কন্ট্রোল রুম) আছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম আছে। সব ধরনের কাজের সমন্বয়নের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একটি সমন্বিত কন্ট্রোল রুম আছে। আইইডিসিআরে আছে পৃথক কন্ট্রোল রুম। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি কন্ট্রোল রুমও কোভিড–১৯ নিয়ে কাজ করছে। গত ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে অজ্ঞাত কারণে মানুষ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে থাকে। ৩১ ডিসেম্বর স্থানীয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কার্যালয় জানায়, নিউমোনিয়ার পেছনে আছে নতুন ভাইরাসের সংক্রমণ। নতুন ভাইরাসটি করোনাভাইরাসের পরিবারভুক্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরবর্তীকালে এর নাম দেয় ‘কোভিড–১৯’। শুরু থেকেই ভাইরাসটির সংক্রমণ হয়েছে অতি দ্রুত। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১১ মার্চ বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করে। বর্তমানে প্রায় ২০০টি দেশে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। কোভিড–১৯ ছড়িয়ে পড়া বহু দেশে বাংলাদেশি নাগরিক আছে। বিদেশি নাগরিক বা প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি শুরু থেকেই ছিল। গত ৮ মার্চ দেশে শনাক্ত হওয়া প্রথম রোগী ছিলেন বিদেশফেরত। বিজ্ঞানীরা যখন এ ভাইরাসের চরিত্র ও ছড়িয়ে পড়ার ধরন সঠিকভাবে নির্ণয় করতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নানা নির্দেশনা দিয়ে বারবার বিশ্ববাসীকে সতর্ক করছে। সংস্থাটি বলেছে, কোনো দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে নতুন ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। এর সঙ্গে দুর্যোগ, যোগাযোগ, তথ্য, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সহ সেনাবাহিনীকেও প্রয়োজনে যুক্ত হতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ কমপক্ষে ১০টি মন্ত্রণালয় করোনা প্রতিরোধের কাজে যুক্ত হয়েছে। বড় চ্যালেঞ্জ সমন্বয় বাড়ানো। তবে পরিস্থিতি কী হতে যাচ্ছে, কত মানুষ আক্রান্ত হতে পারে, কত মানুষের জন্য আইসিইউ শয্যার দরকার হবে—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা বা বিশেষজ্ঞ কারও কাছ থেকে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার ঢাকায় ৯টি হাসপাতাল কোভিড–১৯ চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট করেছে। রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষার সুযোগ বাড়াচ্ছে। কিন্তু কোথায় এর শেষ, তা কেউ বলতে পারছে না। জনস্বাস্থ্যবিদ ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের কার্যকরী পরিষদের সদস্য মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এখনো রোগ কম বলে বা রোগী কম শনাক্ত হচ্ছে বলে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো সুযোগ নেই। অনেকেই হাসপাতাল বা শয্যার সংখ্যা বা ভেন্টিলেটরের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে জোর দিচ্ছেন। কিন্তু জোর দিতে হবে সোশ্যাল আইসোলেশন বা সামাজিক দূরত্বের ওপর। কিন্তু কাজটি জোরদারভাবে হচ্ছে না। সরকার সামাজিক দূরত্ব তৈরির উদ্দেশ্যে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল। ছুটি পেয়ে মানুষ দল বেঁধে ঢাকা ছেড়েছে। ফেরিঘাট, রেলস্টেশন বা বাসস্ট্যান্ডের ভিড় গণজমায়েতের চেহারা পেয়েছিল। এরপর গত দুই দিনে ঢাকা শহরে গাড়ি চলতে শুরু করেছে। দেশের কোথাও কোথাও হাটবাজারে জনসমাগম হচ্ছে। ত্রাণ বা খাদ্যসহায়তা নিতেও মানুষ ভিড় করছে। এসব সংক্রমণ প্রতিরোধের অন্তরায় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এখানে মানুষের আচরণের বিষয়টি যেমন আছে, সরকারি কাজে সমন্বয়হীতার বিষয়টিও আছে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও কোভিড–১৯ বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় কমিটির উপদেষ্টা অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন রোগী কম আছে বলে আত্মপ্রসাদের কোনো সুযোগ নেই। মানুষকে সচেতন হতে হবে, ঠিক আচরণ করতে হবে। ভিড়ভাট্টা একেবারেই করা যাবে না। একবার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।’ সমন্বয়হীন কাজের আরও উদাহরণ আছে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গতকালই সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করা মাস্ক নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি হাসপাতালে ও ব্যক্তিগত চেম্বারে গিয়ে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে আসছেন, এমন অভিযোগ আছে। একই বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছ থেকে নানা ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা প্রথম আলোকে বলেন, ‘সমন্বয় একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিনই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। দিন যত যাবে, সমন্বয় আরও দৃঢ় হবে।’ অন্য চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা, অবকাঠামোগত, সরঞ্জাম সরবরাহে ও জনবলের বিষয়ে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘৮ মার্চ প্রথম রোগীটি শনাক্ত হওয়ার পর থেকে সব ধরনের সক্ষমতা দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের প্রস্তুতি, পর্যবেক্ষণ ও তৎপরতা শেষ অবধি অব্যাহত থাকবে।’ তবে মানুষকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন করে রাখা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সরকারের মধ্যে সংশয় আছে। এর সঙ্গে দেশের অর্থনীতি যেমন জড়িত, তেমনি বহু দরিদ্র মানুষের জীবিকাও জড়িত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এগুলো হচ্ছে কোভিড–১৯–এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। কিন্তু এসব সমস্যা সমাধানের ব্যাপারেও সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। গোটা সরকার একাগ্রভাবে কোভিড–১৯ নিয়ে কাজ করছে।’