করোনার কারণে বন্দী মুক্তির কথা ভাবছে না সরকার

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণ দেখিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কারাবন্দীদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। অনেক দেশে মুক্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে বাংলাদেশে এখনো করোনা ভাইরাসের কারণে কারাবন্দীদের মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি ভাবছে না সরকার। সূত্র বলছে, কারাবিধির ৫৬৯ ধারা অনুসারে যারা ২০ বছর সাজাভোগ ইতিমধ্যে শেষ করছেন তাদের মুক্তি দিতে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে এমন একটি প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল কারা অধিদপ্তর। সেই তালিকা ধরেই কারাবন্দীদের মুক্তি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। ওই তালিকায় হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিসহ মোট ১৪২০ জনের নাম রয়েছে। তবে এই তালিকাটি করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে করা হয়নি। যদিও কারা অধিদপ্তর বলছে, বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর আগে ডিসেম্বরে যে তালিকা তারা পাঠিয়েছে সরকার চাইলে সেই তালিকা থেকে বন্দীদের বর্তমান পরিস্থিতিতে মুক্তি দিতে পারে। এর আগে ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এক হাজারের বেশি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দী মুক্তি পেয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে বন্দী থাকা বৃদ্ধ, নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ—এই পাঁচটি শ্রেণির এক হাজার বন্দীকে তখন মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে বলেন, তাদের কাছে গত ডিসেম্বরে একটি তালিকা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এসব করোনা সংক্রামককে সামনে রেখে নয়। এসব তালিকা তারা নিয়মিত পাঠান। তারা বলেন, আমরা মাদক ও খুনের মামলা বাদ দিয়ে হয়তো বড়জোর তিন শ জনের একটি তালিকা করতে পারি। তাও যাচাই বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, আমরা এখনো কোনো তালিকা করিনি বা মুক্তির সিদ্ধান্ত নিইনি। বিষয়টা খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে। চিন্তাভাবনা চলছে। অনেক দিন ধরেই কারা অধিদপ্তর ৫৬৯ ধারায় বন্দীদের মুক্তি দেওয়ার ব্যাপারে অনুরোধ করছেন। এটার জন্য কমিটি আছে। কমিটি যাচাই -বাছাই করবে। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে । কতজন মুক্তি পেতে পারেন সেটা বিবেচনা হবে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত ও প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষরের পর। তিনি বলেন, ছোট অপরাধ, অসুস্থ কিংবা ভালো ব্যবহার বা কাজ করেছেন এমন বন্দীদের এ সুযোগ দেওয়া হয়ে থাকে। শীর্ষ সন্ত্রাসী বা দুর্ধর্ষ ডাকাতেরা এ সুবিধা পাবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, প্রশ্নই ওঠে না। এই ধারা তাঁদের জন্য প্রযোজ্য হবে না।’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, কারাবিধির ৫৬৯ ধারা অনুসারে কোনো বন্দী তাঁর সাজার মেয়াদের দুই-তৃতীয়াংশ খাটলে, সেই বন্দীর বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ না থাকে, তবে সরকার চাইলে বিশেষ সুবিধায় তাঁকে মুক্তি দিতে পারে। এ জন্য রাষ্ট্রপতির কোনো অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। এই সুবিধায় মুক্তি দেওয়ার জন্য গত কয়েক বছর দেশের সব কারাগার থেকে বন্দীর তালিকা তৈরি করা হয়। বন্দীদের বয়স, সাজার ধরন, মেয়াদ, শারীরিক অবস্থা এবং কারাগারে তাঁরা কোনো অপরাধ করেছেন কি না, তা বিবেচনায় নিয়ে নাম চূড়ান্ত করা হয়। সেই তালিকা খতিয়ে দেখার জন্য (ভেটিং) আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় । এরপর তা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেলে কোনো সময় বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়। কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মোস্তফা কামাল পাশা প্রথম আলোকে বলেন, আমরা মন্ত্রণালয়ে অনেক আগেই প্রস্তাব পাঠিয়েছি। এটি নিয়মিত কাজ। কিন্তু এখনো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমাদের কিছু জানায়নি। ২০ বছর সাজা খাটার পর কারাবিধির ৫৬৯ ধারায় অসুস্থ ও অচল বন্দীদের মুক্তি দেওয়ার বিধান রয়েছে। আগেও দেওয়া হয়েছে। তবে এখন যেহেতু করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের বিষয়টি সামনে আসছে তাই গুরুত্ব দিয়েই তাড়াতাড়ি বন্দী মুক্তি চাইছেন। কারাগারের একজন কর্মকর্তা জানান, কারা অধিদপ্তর থেকে ৫৯৪ বিধিতেও ২১ জন অচল অক্ষম, অন্ধ পঙ্গু ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত বন্দীর মুক্তির প্রস্তাব জেলা কমিটি থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এর আগে ৩০৯২ জন হাজতি বন্দীর জামিন যোগ্য ধারায় আদালত চাইলে মুক্তি দিতে পারে এই তালিকা কারা অধিদপ্তর পাঠিয়েছে। তবে কিছু নির্ভর করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়রে সিদ্ধান্তের ওপর। প্রসঙ্গগত করোনাভাইরাসের পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ভারতও কিছু বন্দীকে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। ইরানে বহু বন্দীকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ব্রিটেন সরকারও এই মহামারির কারণে জেল থেকে কিছু বন্দীকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও কারা বন্দীদের মধ্যে যারা বয়স্ক এবং যাদের নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা আছে তাদের তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।