মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে ধারণ হবে একাত্তরের বিবরণ

রোববার ঢাকার সবুজবাগ এলাকায় ঢাকা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা জানান।

মন্ত্রী বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এই জুলাই-অগাস্ট থেকে শুরু হবে, আমাদের সমস্ত জীবিত মুক্তিযোদ্ধার বক্তব্য রেকর্ড করা হবে। ৫ থেকে ১০ মিনিট এই রেকর্ড করা হবে। আমি কীভাবে যুদ্ধ করলাম, নয় মাস কীভাবে কী করলাম সেই বিষয় রেকর্ড করে রাখা হবে।

“কেয়ামত পর্যন্ত যাতে মুক্তিযোদ্ধাদের কথা থাকে, সেজন্য এই রেকর্ড ধারণ করে আর্কাইভে রাখা হবে। সেজন্য ৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, এই প্রকল্প পাসও হয়েছে।”

বীর মুক্তিযোদ্ধারা মারা যাওয়ার পর তাদের সমাধি চিহ্নিত করে রাখতেও একটি প্রকল্প শুরু হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, “একটা কবর দেখলে যেন একশ বছর, পঞ্চাশ বছর পর বলতে পারে যে, এটা মুক্তিযোদ্ধার কবর। অন্য ধর্মের যারা, তাদের জন্য সেইভাবে ব্যবস্থা করেছি। যত বীর মুক্তিযোদ্ধা মারা গেছেন, তাদের কবর একই ডিজাইনে নির্মাণ করব। গত বছর থেকে তা নির্মাণ শুরু হয়েছে, এবার আরও বড় পরিসরে কাজ হবে।”

পাশাপাশি দেশের যত জায়গায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ হয়েছে, সেসব জায়গায় একই নকশার স্মৃতিস্তম্ভ করা হবে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী।

তাছাড়া একই নকশায় দেশের সকল বধ্যভূমি সংরক্ষণ করার কাজও চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

দেশের ৬৪ জেলার ইতোমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। সর্বশেষ রোববার ঢাকা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স উদ্বোধন করেন মন্ত্রী মোজাম্মেল হক।

জেলার পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “৪০০ উপজেলায় কমপ্লেক্স নির্মাণ হচ্ছে, বাকিগুলোও হবে, যাতে করে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা ঠিকানা হয়। পরের প্রজন্ম যেন সেখানে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারে।”

মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার ব্যয়ের জন্য অনুদান ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী মোজাম্মেল হক বলেন, “দেশের ২২টি বিশেষায়িত হাসপাতালে ২৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা করে অগ্রিম দিয়েছি, যাতে মুক্তিযোদ্ধারা বিনা পয়সায় ওষুধসহ চিকিৎসা পান, সবকিছু সরকারিভাবে দেওয়া হবে।”

অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রতিটি উপজেলায় যে পরিমাণ বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে, তা দ্বিগুণ করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “যারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল, তাদের জন্য এসব বাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। আমরা যারা সচ্ছল, আমরা এটার দাবি করব না।”

আওয়ামী লীগ সরকারই যে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে ভাতা চালু করেছে, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, “শেখ হাসিনা ছিয়ানব্বই সালে ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক সক্ষমতা ছিল না। তিনিই প্রথম ৩০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া শুরু করেন। আজকে তা ১২ হাজার টাকা হয়েছে। আগামী মাস থেকে তা ২০ হাজারে উন্নিত হবে।”

পরবর্তী প্রজন্ম যাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করতে পারে, সে বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানান মন্ত্রী।

তিনি বলেন, “আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি, কিন্তু আমার ছেলে-মেয়ে, ভাই-ভাতিজা, নাতি-নাতনি কী করে, তাদের যদি আমি না দেখি, তাহলে ঠিক হবে না। আমি চলব এক ধারায়, আমার পরের প্রজন্ম চলবে আরেক ধারায়- তাহলে এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য হবে।”

সরকার ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ধাপে ধাপে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করছে। ইতোমধ্যে আরও ১৮ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম যাচাই-বাছাই হয়ে গেছে। আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে সেই তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানান মোজাম্মেল হক।

তিনি বলেন, “আমাদের হিসাবে, এই তালিকায় (মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা) প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার হবে। আরও কিছু আপিল বাকি আছে, এতে আমার ধারণা, এক লাখ ৮০ হাজার বা সর্বোচ্চ ৮৫ হাজার হবে।”

চূড়ান্ত তালিকা করার আগে বিএনপি আমলে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় দুই লাখ ৩০ হাজার জনের নাম ছিল বলে জানান তিনি।

ঢাকার জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি শাহাজান খান, ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সংসদ সদস্য বেনজীর আহমদ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব খাজা মিয়া, বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ, ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন সরদারসহ অনেকে বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে নির্মাণের প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ শাহজাহান আহমেদ জানান, ঢাকা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা প্রণয়ন শুরু হয় ২০১৮ সালে। দুইবার এর স্থান পরিবর্তন হয়। পরে মহামারীর কারণে নির্মাণ কাজে আরও বিলম্ব হয়। এর আগে ৬৩টি জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ শেষ হয়েছে।